আজঃ রবিবার ● ২রা আষাঢ় ১৪৩১ ● ১৬ই জুন ২০২৪ ● ৯ই জিলহজ্জ ১৪৪৫ ● বিকাল ৩:৪১
শিরোনাম

By মুক্তি বার্তা

রাত এলেই পেশীশক্তির জোরে নারীদের ধর্ষণ করার ফাঁদ পাতে চট্টগ্রাম নগরীর অনেক সিএনজি চালক

ফাইল ছবি

নিউজ ডেস্কঃ চট্টগ্রাম নগরীতে এমনও সিএনজিচালকের খোঁজ মিলেছে, যার কাজই ছিল শিশুদের ধর্ষণ করা। সিএনজিচালকদের অনেকে করে অভিনব কৌশলে ছিনতাই করে। তবে পুলিশ বলছে, এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আছে তাদের কাছে।

সূর্য অস্ত গিয়ে রাত নামার পরপরই চট্টগ্রাম নগর কিংরা নগরীর বাইরে সিএনজিচালকদের একটি অংশ হয়ে ওঠে রীতিমতো ‘দানব’। কখনও নির্জনতার সুযোগে, কখনও আবার পেশীশক্তির জোরে নারীদের ধর্ষণ করার ফাঁদ পাতে তারা।

২০১৯ সালের ৫ জুলাই আনোয়ারার কর্ণফুলী ইপিজেডের কর্মস্থল থেকে রাতের বেলা চন্দনাইশের নিজ বাড়িতে ফেরার পথে গণধর্ষণের শিকার হন এক কিশোরী। অসুস্থ অবস্থায় রাস্তার পাশ থেকে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান স্থানীয়রা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মামুন ও হেলাল নামে দুই সিএনজিচালককে আটক করে। তারা ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তাদের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে ঘটনার মূল হোতা আব্দুন নুর। সেই জবানবন্দিতে আসামিরা জানায়, ধর্ষণের পরিকল্পনা করেই তারা চারজনের মধ্যে একজন চালকের বেশে ও অন্যরা যাত্রীবেশে চাতরি চৌমুহনী এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিশোরী কোরিয়ান ইপিজেডে কর্ণফুলী সু ফ্যাক্টরিতে কাজ শেষে চন্দনাইশে বাড়ি যাওয়ার জন্য ওই সিএনজি অটোরিকশায় উঠে। এরপর চৌমুহনী এলাকার কালারমার দীঘি এলাকায় পৌঁছালে তারা ওই কিশোরীকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা। এই ঘটনার মূল হোতা জীবিত আব্দুন নুরকে ধরতে না পারলেও পরের মাসে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে আনোয়ারা থানা পুলিশ।

ঠিক তারও এক বছর আগে নগরীর জিইসি মোড় থেকে এক নারী চিকিৎসক সিএনজিতে চড়ে হামজারবাগের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মুরাদপুর এলাকায় রাস্তায় গাড়ির ভীড় থাকার কারণে চালক গাড়ি নিয়ে ফরেস্ট এলাকার ভিতর দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু ফরেস্ট গেইটে যাওয়ার পর নির্জন পাহাড়ি এলাকায় গাড়ি থামিয়ে তরুণী চিকিৎসককে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে ওই চালক। পরে ওই চিকিৎসকের চিৎকারে বনবিভাগের নৈশপ্রহরীরা সিএনজিচালক জামশেদকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি সীতাকুণ্ডের কুমিরা এলাকা থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে আসার সময় অটোরিকশার ভেতর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন আসাদুজ্জামান নামে এক ব্যবসায়ী। ওই অটোরিকশার চালক বিল্লাল নিজেই ছিলেন ছিনতাইকারী। চালকসহ চার ছিনতাইকারী অস্ত্রের মুখে চলন্ত গাড়িতে আসাদুজ্জামানকে জিম্মি করে টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং তাকে গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এ সময় তারা পালিয়ে যেতে থাকলে আসাদুজ্জামানের চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে অটোরিকশার গতিরোধ করে। পরে ছিনতাইকারীরা অটোরিকশা ফেলে পালিয়ে যায়। পাহাড়তলী থানার পুলিশ একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে সিএনজিচালক বিল্লালসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, আকবরশাহ ও খুলশী এলাকায় গত ৭ মাসে অন্তত ৮ শিশুকে একই কায়দায় ধর্ষণ করা হয়। প্রথমে শিশুদের চকলেট ও টাকার প্রলোভন দেখিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয় চালক। এরপর পাশের পাহাড়ে নিয়ে ধর্ষণ করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। শিশুরা কান্না করলে ছুরি দিয়ে ভয় দেখানো হয়। এভাবে একই কায়দায় একের পর এক শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ায় এলাকায় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে সিএনজিচালক বেলাল হোসেন দফাদারের ছবি সংগ্রহ করে ধর্ষণের শিকার শিশুদের দেখানো হয় এবং তারা বেলালের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করে।

চলতি বছরের জুলাই মাসে সিএনজিচালক ধর্ষক বেলালকে বায়েজিদ থানা পুলিশ আটক করতে গেলে পুলিশের সাথে ‘গোলাগুলি’ হয়। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেলালকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বেলালের বিরুদ্ধে থানায় ১৪টি মামলা ছিল, যার ১০টিই ছিল ধর্ষণের অভিযোগে।

ঠিক একমাস আগে ৩১ জুলাই সকালে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার সিডিএ এক নম্বর রোডের বাসা থেকে সিএনজি অটোরিকশা করে যাওয়ার সময় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ষোলশহর দুই নম্বর গেইট থেকে জিইসি মোড় অংশে ছিনতাইয়ের শিকার হন মোহাম্মদ ইব্রাহীম নামের এক ব্যক্তি। আগে থেকে কেনা গরুর টাকা পরিশোধ এবং মোবাইল কেনার জন্য দুই লাখ নয় হাজার টাকা নিয়ে অটোরিকশায় উঠেছিলেন তিনি। ঘটনার শিকার মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ফ্লাইওভারে ওঠার পর জিইসি মোড় অংশের কাছাকাছি আসতেই সিএনজিচালক গাড়ি নষ্ট হয়েছে বলে তাকে নেমে দাঁড়াতে বলেন। এ সময় পেছন দিক থেকে লাল রঙের মোটরসাইকেলে তিন যুবক এসে দাঁড়ায় এবং দুইজন আমাকে জোর করে অটোরিকশায় তুলে ফেলে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। অটোরিকশার ভেতরে আমার সাথে থাকা টাকা জোর করে ছিনতাই করে নিয়ে নেয় এবং জিইসি মোড়ের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়।’

সবশেষ ২৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টায় বায়েজিদ থানার অক্সিজেন এলাকায় পাঁচজন সিএনজিচালক পালাক্রমে ধর্ষণ করে এক পোশাক শ্রমিককে। ওই পোশাক শ্রমিক স্বামীসহ বাসায় ফিরছিলেন। পথে তার স্বামীকে আটকে রেখে শফি, বাদশা মিয়া, মো. রবিন, মো. জাবেদ ও মো. ইব্রাহীম নামের ওই পাঁচ সিএনজিচালক এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে ভিকটিমের স্বামী পুলিশের সহযোগিতায় স্ত্রীকে উদ্ধার করেন। পুলিশ ‘নাটের গুরু’ শফি ছাড়া বাকিদের হাতেনাতে আটক করে।

ধারাবাহিকভাবে সংগঠিত এই অপরাধে যারা সম্পৃক্ত তাদের পূর্ণাঙ্গ ডাটা পুলিশের কাছে আছে জানিয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর জোন) বিজয় বসাক চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘অপরাধ অনুযায়ী ছোটবড় সব অপরাধে সম্পৃক্ত অপরাধীর পূর্ণাঙ্গ ডাটা আমাদের কাছে আছে। প্রতিটি ঘটনায় আমরা অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে পেরেছি। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

মুবার্তা/এস/ই/চ/প

ফেসবুকে লাইক দিন