আজঃ রবিবার ● ৮ই বৈশাখ ১৪৩১ ● ২১শে এপ্রিল ২০২৪ ● ১১ই শাওয়াল ১৪৪৫ ● বিকাল ৩:২২
শিরোনাম

By মুক্তি বার্তা

৩২ জেলার ১৫৩ উপজেলা বন্যাকবলিত

বন্যার বর্তমান পরিস্থিতি

মাসব্যাপী বন্যার পর কিছু নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এক দিনের ব্যবধানে নতুন করে দুটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া ১০১টি  পর্যবেক্ষণাধীন পানিসমতল স্টেশনের ৩৭টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। 

গত তিন-চার দিন ধরে শুধু বালু নদ রাজধানীর ডেমরা পয়েন্টে বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। সোমবার নতুন করে মিরপুর পয়েন্টে তুরাগ এবং টঙ্গীতে টঙ্গী খাল বিপদসীমার উপরে চলে গেছে। ফলে তিন দিক দিয়ে রাজধানী বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে মোট ৩২ জেলার ১৫৩ উপজেলা বন্যাকবলিত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এসব তথ্য জানিয়েছে। দেশের উত্তর এবং পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি থমকে গেছে। উজান থেকে আবারও বানের পানি নেমে এসে অবনতি ঘটাতে পারে এই দুই অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির। অপরদিকে ভারি বৃষ্টিপাতে উজান থেকে আসা পানি মধ্যাঞ্চলে অন্তত ১৭ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে জোয়ারের কারণে সাগরে পানির স্তর বেড়ে গেছে। এ কারণে নদ-নদীর পানি সাগরে নিষ্কাশন হ্রাস পেয়েছে। ফলে চলতি সপ্তাহে বন্যার পানি বিভিন্ন এলাকায় সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে থাকতে পারে। তবে ঈদুল আজহার পর নদ-নদীগলোর পানির সমতল হ্রাসের সম্ভাবনা আছে। এমন পরিস্থিতিতে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির কোনো আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলামের দেওয়া তথ্য মতে জানা যায়, চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় সাগরে জোয়ারের পানি কয়েক ফুট বেড়ে যায়। এরপর যদি মৌসুম সক্রিয় থাকে তাহলে পানির স্তর আরও বাড়তে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে নদ-নদী থেকে সাগরের দিকে পানি কম যায় অথবা যেতে পারে না।

তিনি বলেন, বিপরীত দিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে ও হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশীয় অঞ্চলে সোমবারই ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৬৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর মধ্যে ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ’ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। এতে ৩০ জুলাইয়ের পর চতুর্থ দফায় বন্যা শুরু হতে পারে। সেই হিসাবে ব্রহ্মপুত্রে বন্যা আগস্টের ১০-১৪ তারিখের আগে শেষ হচ্ছে না। এ পরিস্থিতির মধ্যে আবার গঙ্গায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ফলে মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তুলনামূলক তীব্র হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতে ঢাকার আশপাশের নদ-নদীতে পানি বাড়ছে। রাজধানীর নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চল ১০-১২ দিনের জন্য বন্যাকবলিত থাকতে পারে।

এফএফডব্লিউসি সূত্রে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমছে। এই ধারা ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। কিন্তু আগামী ৪৮-৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। গঙ্গা নদীর পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। যমুনা থেকে নেমে আসা পানি জমছে পদ্মা অববাহিকায়। এতে মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের পরিস্থিতিও অবনতি ঘটাচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এবং এফএফডব্লিউসি বলছে, এ মুহূর্তে দেশের ৩১টি জেলা বন্যা উপদ্রুত এবং মোট ৩২টি বন্যাকবলিত। জেলাগুলো হচ্ছে : কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালমনিরহাট, নীলফামারী, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী। এগুলোর মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, নওগাঁ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, ঢাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বন্যা পরিস্থিতি একই রকম থাকতে পারে।

সারা দেশের চিত্র : বানভাসি দুর্গত মানুষের গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে। বন্যার পানিতে নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট ও বন্যার পানিতে পয়ঃনিষ্কাশনের জায়গা তলিয়ে বিপাকে পড়েছে বানভাসিরা। বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে মাছচাষীরা। দুর্গত এলাকায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকট অব্যাহত রয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বন্যাদুর্গতরা যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ করছেন। ফরিদপুর শহর রক্ষা বাঁধের ২০ মিটার ধসে গেছে। এতে শহরে পানি ঢুকেছে।

ফরিদপুর : ফরিদপুর জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার ৫টি উপজেলার ৫শ’ ৪১টি গ্রামের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। এদিকে সোমবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে শহর রক্ষা বাঁধের সাদীপুর এলাকায় ফের বাঁধের প্রায় ২০ মিটার ধসে গেছে। এতে শহরের দিকে পানি ঢুকছে। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা ধসে যাওয়া স্থান পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগেও এই স্থানে ২২ মিটার শহররক্ষা বাঁধ মাটিভর্তি জিও ব্যাগ দিয়ে মেরামত করা হয়েছিল। সোমবার দুপুরে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বাঁধটির মেরামতকৃত অংশ দুর্বল হয়ে ফের ভেঙে যায়।

টাঙ্গাইল ও দেলদুয়ার : টাঙ্গাইলে সব কটি নদ-নদীর পানি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলার ১১টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তবে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের গ্রামগুলো নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। বন্যায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেলদুয়ারে ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় ধলেশ্বরী নদীর পানি এলাসিন পয়েন্টে বেড়ে বিপদসীমার ১৬৩ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার দেউলী, এলাসিন ও লাউহাটী ইউনিয়ন পানিতে ভাসছে।

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) : সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে সুরমাসহ সব নদী-নালা, হাওর, খাল-বিলের পানি ক্রমশ কমলেও নিম্নাঞ্চলে রয়েছে অপরিবর্তিত। উপজেলার সুরমা, বগুলা, লক্ষ্মীপুর, বাংলাবাজার ও নরসিংপুর ইউনিয়ন থেকে পানি মোটামুটি কমেছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের সংযোগ সড়কগুলো উপর্যুপরি বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়াও খামারিদের কয়েক কোটি টাকার মাছ ভেসে যাওয়া ছাড়াও দু’দফা রোপা আমনের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত বিনষ্ট হওয়াতে চরম বিপাকে পড়েছেন উপজেলাবাসী।

শরীয়তপুর : শরীয়তপুরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ৩০ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৪টি উপজেলায় ২ লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট হাঁটু ও কোমর পানিতে ডুবে গেছে। জেলার জাজিরা নড়িয়া ভেদরগঞ্জ ও শরীয়তপুর সদর উপজেলা ও পৌর এলাকার বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বন্যার পানিতে দিন দিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

সরিষাবাড়ী (জামালপুর) : যমুনা ও অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে ২৪ ঘণ্টায় জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বন্যার পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। এতে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও পৌর এলাকায় বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। এতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, খাদ্য গুদাম, থানা, সমাজসেবা অফিস, মহিলা বিষয়ক অফিস, বাসস্ট্যান্ড, ফায়ার সার্ভিস, বাজারের মধ্যে আরামনগর ও শিমলা বাজারসহ প্রধান সড়কগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সরিষাবাড়ী রেল স্টেশনের রেল লাইন।

বগুড়া : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙ্গালি নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দুটি নদীতে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তৃতীয় দফা বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যা দুর্গতরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত বছর ঈদে কোরবানি দিলেও এবার অনেকে পারবেন না। ফলে তারা পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবেন।

টেকেরহাট (মাদারীপুর) : সোমবার মাদারীপুরের ৪টি উপজেলা নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে গত এক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানির স্রোতের তীব্রতায় দ্রুত পানি প্রবেশ করে শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত চর ও সংলগ্ন ইউনিয়নগুলোতে। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। ক্রমেই নতুন করে বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে জেলার বাকি ৩টি উপজেলা রাজৈর কালকিনি ও মাদারীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ। জেলায় এ পর্যন্ত ৩৫ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় সব নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি এখনও বিপদসীমার অনেক ওপরে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। রোববার বিকাল ৩টা থেকে সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি তিস্তামুখঘাট পয়েন্টে ১০ সে.মি. হ্রাস পেয়ে এখনও বিপদসীমার ৮৮ সে.মি. এবং ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে এ সময় ৩ সে.মি. কমে বিপদসীমার ৭১ সে.মি. ওপর দিয়ে বইছে। এছাড়া করতোয়া নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ২২ সে.মি. কমে এখন বিপদসীমার ১১ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে কমতে শুরু করেছে ধরলা নদীর পানি। এছাড়াও কমে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও। ধরলা নদী অববাহিকার পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। বন্যার্তরা সাময়িক জলবন্দি অবস্থা থেকে কিছুটা মুক্তি পেলেও এখন ভাঙা বাড়িঘর ও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে। এছাড়াও আসন্ন ঈদের এই সময়টাতে তারা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। সোমবার বিকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৬৩ ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪১ এবং ধরলা নদীর পানি ব্রিজ পয়েন্টে ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বানভাসি কৃষকরা আমনের বীজতলা নিয়ে বিপাকে রয়েছে।

ফেসবুকে লাইক দিন