আজঃ রবিবার ● ২রা আষাঢ় ১৪৩১ ● ১৬ই জুন ২০২৪ ● ৯ই জিলহজ্জ ১৪৪৫ ● দুপুর ২:২০
শিরোনাম

By মুক্তি বার্তা

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন মধ্যপন্থীর শ্রেষ্ঠতম মডেল 

ফাইল ছবি

সোহেল সানিঃ মধ্যপন্থীরা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত জ্ঞানের পতাকা বহন করে নিয়ে যাবে, রক্ষা করবে জ্ঞানকে অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির হাত থেকে। এ কথাটি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর। নিজে সবদিক থেকেই ছিলেন মধ্যপন্থীর শ্রেষ্ঠতম মডেল। কস্মিনকালেও উগ্রপন্থী ছিলেন না এবং প্রয়োজনে নরমপন্থাও আঁকড়ে থাকেননি। সত্যিই সূরা বাকারা-১৪৩ নম্বর আয়াতের দিকে দৃষ্টি দিলে এ অমোঘ সত্য উদ্ভাসিত হয়। সূরা বাকারার এ আয়াতে বলা হয়েছে, ” ওয়াকাজালিকা জাআলনাকুম উম্মাতাও ওয়াসাতা” অর্থাৎ “এমনিভাবে আমি তোমাদিগকে (মুসলমানদেরকে) মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি ” (সূরা বাকারা-১৪৩)।
মহান আল্লাহ সূরা আল ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন, “তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত-মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।” “শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়” ঘোষণা করার কারণসমূহ পবিত্র কুরআনের একাধিক সূরার একাধিক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য আয়াত সূরা বাকারায় এসেছে। যেখানে আয়াতের ব্যাখ্যায়, মুসলিম সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ মধ্যপন্থী হওয়া এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের মধ্যপন্থার পূর্ণ বিবরণ সেখানে প্রদত্ত হয়েছে। জীবনের সবক্ষেত্রে ইসলাম মধ্যম সুষম পন্থা অবলম্বনের সুপারিশ করেছে।
আর এটাই সিরাতুল মুস্তাকিম অর্থাৎ সরল পথ, আর এ পথের বিপরীত যত মত তার সবই গজবে পতিত। সপ্তম শতক থেকে প্রায় ১০০০ বছর ইসলাম রাষ্ট্রাচার, মানবিক যুদ্ধনীতি, কল্যাণমুখী সংবিধান প্রতিষ্ঠা করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি চিকিৎসা, জীবন আচারবিধি সবকিছুতেই মুসলিম মনীষীরা অবদান রেখে গেছেন। কয়েক লক্ষ পৃষ্ঠার চিকিৎসা সংক্রান্ত থিসিস ইবনে সিনা প্রণয়ন করেছিলেন, তা কি বিশ্ব আজও পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পেরেছে? শূণ্যের (০) আবিষ্কার এর প্রয়োগে গণিতে যে বিপ্লব তা কি মুসলিম মনীষার মাধ্যমে হয়নি? এলজাবরা ( বীজগণিত) আবিষ্কার কে করলো? পৃথিবীর যে মানচিত্র মুসলিম জ্যোতিবিদরা প্রণয়ন করেন, তাকি আজও চালু নেই, কোন ভুল কি ধরা পড়েছে? গোটা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বেশি হচ্ছে।
আবার জিহাদের নামে যা করা হচ্ছে তাও সঠিক পন্থা নয়। প্রকৃত পক্ষে জিহাদ হলো অবিচারের বিরুদ্ধে এক ন্যায় যুদ্ধ। কোনো নির্দিষ্ট – ভূখন্ডের অথবা সংঘবদ্ধ কোন জাতি গোষ্ঠীর স্বীকৃত নেতার তরফে জিহাদের ঘোষণা আসতে হয়। কোন প্রান্তিক দলের কাছ থেকে এ ঘোষণা আসতে পারে না। মহানবী (সাঃ) পীড়নের কঠিনতম দিনগুলোতেও মক্কায় অজস্র তুলে নেননি। বরং হিজরত করে অন্য শহর মদীনায় চলে গেছেন। কিন্তু তারপরও কাফেররা আক্রমণ বন্ধ রাখেনি। বিশ্ববাসীর জীবন যখন বিপন্ন এবং সর্বোপরি একমাত্র রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন এলে ঠিক তখনই গ্রহণ করা যেতে পারে সশস্ত্র পন্থা।
কুরআনে যুদ্ধ বিষয়ক আয়াত তখনই নাজিল হলো, যখন বিশ্বাস ভঙ্গ করার জন্য নির্যাতনের পথ বেছে নিয়ে ছিলো কাফেররা। মহানবী (সাঃ) এবং সাহাবীরা বাধ্য হয়ে হাতে অস্র তুলে নিয়েছিলেন। সেই দেড় হাজার বছর আগে জিহাদ বিষয়ে যে বিধান প্রণীত হয়েছিলো, সভ্যতা ও মানবতার বিচারে আজও তা কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। জেহাদেই প্রথম স্পষ্টভাবে নারী, শিশু বৃদ্ধ এবং নিষ্পাপদের হত্যা না করার বিধান জারি হয়। এমনকি তালগাছ পর্যন্ত ধ্বংস না করার কথা বলা হয়েছিলো। প্রতিটি জিহাদ মুসলমানদের দ্বারা সংঘটিত কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধই জিহাদ নয়। অথচ, খ্রীষ্টানদের ধর্মযুদ্ধ যা ক্রসেড হিসাবে পরিচিত, তা বরাবরই “বর্বর ধর্ম হিসেবে ইসলামকে” তুলে ধরতে জিহাদকে সামনে নিয়ে আসা হয়। ফ্রেডরিক (১১২৩-১১৯০) যখন ক্রসেডের সূচনা ঘটায় তখন মিশরের মুসলিম শাসক সুলতান তাকে জ্যোতিবিদ্যা বিষয়ক একটি ঘড়ি (এস্ট্রোনোমিকাল) উপহার দেন। আর ওই ঘড়িটিই খুলে দেয় ইউরোপের জ্ঞানের দ্বার। অনাবিষ্কৃত, শীতার্ত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত এক আধা সামন্ত – আধা দাস ভিত্তিক মূল্যবোধের ইউরোপে তখনও পর্যন্ত না রচিত হয়েছিল কোনো কাল বিজয়ী সাহিত্য, না ছিলো বিজ্ঞানের কোনো জ্ঞান, না ছিলো জনগণের কোনো মৌলিক অধিকার এমনকি না ছিলো কোনো ভদ্রজনোচিত খাদ্যাভ্যাস তথা মর্যাদাকর জীবনযাপন প্রণালী। এভাবেই একসময় শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী মহান উত্থানের ঊষালগ্নে সূচিত হলো ইউরোপীয় রেঁনেসা।
সাম্য-মৈত্রী, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ইত্যকারসব বৈপ্লবিক চেতনা প্রবেশ করলো জনমানসে। কূপমন্ডুক খ্রীষ্টীয় পাদ্রীতন্ত্রের হাজার বছরের শৃঙ্খল আর বিবেকহীন সামন্তভুস্বামীদের পীড়ন মূলক শোষণ যন্ত্রটিকে রেঁনেসার জোয়ারে ভাসিয়ে নিলো কালজয়ী সাহিত্য ও জনমানসের উন্নত সাংস্কৃতিক কৃষ্টি। এ সমগ্র উত্থানটি কিন্তু মাত্র ৬ শত বছর আগের। স্বপ্নের ও স্বাদের আমেরিকা তখনও অনাবিষ্কৃত, রানী ইসাবেলা বা কলম্বাস বা অ্যামিকোগো’র কেউ জন্মই নেননি।
কেবল ভাইকিং নাবিকরা মাঝেমধ্যে আতলন্তিক পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে আমেরিকার আদি মালিক রেড ইন্ডিয়ানদের না- হক কষ্ট দিতো। সুসভ্য ফ্রান্স আর ঐতিহ্যবাহী ইংল্যান্ডে যখন একটি মাত্র স্কুলও চালু হয়নি তখনও হযরত আলী (রাঃ) পরিচর্যায় বেড়ে উঠা আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ও ইমামেআজমআবু হানিফা (রহঃ) থেকে বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহঃ) সহ অসংখ্য মুসলিম মনীষার পদস্পর্শে ধন্য) বাগদাদে ছিলো শতশত বইয়ের দোকান।
বলা হয়, মঙ্গলরা যখন বাগদাদ ধ্বংস করছিলো টাইগ্রিস নদীর অর্ধেক লাল হয়ে গিয়েছিলো মুসলমানদের পবিত্র রক্তে, বাকী অর্ধেক বইয়ের কালো
কালিতে।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
মুবার্তা/এস/ই

ফেসবুকে লাইক দিন