আজঃ বুধবার ● ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ ● ২রা ডিসেম্বর ২০২০ ● ১৬ই রবিউস-সানি ১৪৪২ ● রাত ১১:২৫
শিরোনাম

By মুক্তি বার্তা

ডিলারশীপ রক্ষায় চৌগাছা কৃষি কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ!

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিনিধি, যশোরঃ যশোরের চৌগাছায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডিলারদের সার বিক্রি করতে কড়াকড়ি আরোপ করায় চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনকে ব্যাপক তদবিরের মাধ্যমে স্ট্যান্ড রিলিজ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার বিসিআইসি সার ডিলার এবং উপজেলা বিএনপির শীর্ষনেতাদের বাচাতেই উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষনেতা একজন জনপ্রতিনিধিকে মোটা অংকের অর্থদিয়ে এই বদলি করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ। এরআগে ডিলারদের অব্যাহত হুমকির প্রেক্ষিতে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে চৌগাছা থানায় জিডিও করেছিলেন এই কর্মকর্তা।
গত ৯ নভেম্বর এই অফিস আদেশ হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ আসাদুল্লাহ আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ১২ নভেম্বর। আদেশে লেখা রয়েছে এটি স্ট্যান্ড রিলিজ বলে গন্য হবে। একই আদেশে রইচ উদ্দিনের পূর্বেই চৌগাছায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দায়িত্বপালনকারী বর্তমানের মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম শাহাবুদ্দিন আহমেদকে চৌগাছায় কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়েছে। ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ায় তাকেও সে সময় স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়েছিলেন চৌগাছার সার ডিলাররা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে ধারাবাহিক অনিয়মের অভিযোগে ও কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মেনে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রিসহ নানা অভিযোগে উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপজোলা বিএনপির ১নং যুগ্ম-আহবায়ক ও সাবেক সেক্রেটারী ইউনূচ আলী দফাদারের মালিকানাধীন মেসার্স ইউনূচ আলীসহ উপজেলার তিন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলের সুপারিশ করে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। ওয়ান ইলেভেনের সময়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে উপজেলার এই বিএনপি নেতা ইউনূচ আলী দফাদার গ্রেফতার হয়ে জেল খাটেন।
বাতিলের সুপারিশকৃত অন্য দুই ডিলার হলেন পাতিবিলা ইউনিয়নের সার ডিলার ফরিদুল ইসলামের মালিকানাধীন মেসার্স ফরিদুল ইসলাম এবং বিএনপি নেতা আতিকুর রহমান লেন্টুর মালিকানাধীন মেসার্স শয়ন ট্রেডার্স। এদের মধ্যে শয়ন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে উপজেলার বাইরে বিক্রি করে দেয়া, অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি, মূল্য তালিকা না টাঙানোসহ ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ রয়েছে। গত ২০ আগস্ট ১৭ মেট্রিকটন ডিএপি সার উত্তোলন করার আগমনি বার্তা দিয়েও সার গুদামে না তোলায় তার বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমান আদালত জরিমানা করলেও তিনি নিবৃত হননি। এছাড়া ইউনূচ আলী ও ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন (৫০ মেট্রিকটন) গুদাম না থাাকা, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র না থাকা, উত্তোলনকৃত সার গুদামে না এনে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়া, ধারাবাহিকভাবে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা না মানাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এরআগে কৃত্রিম সার সংকট দেখিয়ে উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের সার সরকারি মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ৮/১০ টাকা বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছেন ডিলাররা শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে অভিযানে নামে কৃষি বিভাগ। তখন বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শয়ন ট্রেডার্সসহ কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে ভ্রাম্যমান আদালত চালিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়। গত ১৩ অক্টোবর উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পরপরই মোটা অংকের টাকা নিয়ে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করতে থাকেন অভিযুক্ত সার ডিলাররা।
এরপর তিন ডিলারের ডিলারশীপ বাতিলের সুপারিশের বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা হবে বলেন যশোর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিনও সেই কমিটির একজন সদস্য। সেই তদন্ত এখনো সম্পন্ন না হতেই তদন্তকমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বিশেষ বদলি নিয়ে উপজেলার সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলার সচেতন মহলের প্রশ্ন জেগেছে তদন্তে অপরাধী বিএনপি নেতাদের ডিলারশীপ বাঁচাতেই অনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে উপজেলা কৃষি অফিসারকে বদলি করা হলো? তাদের কথা ভালো কাজের পুরস্কার যদি স্ট্যান্ড রিলিজ হয় তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর ভালো কাজ করতে চাইবেন না।
এবিষয়ে উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান বলেন ‘‘চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন একজন সৎ কর্মকর্তা। তিনি সরকার নির্ধারিত মূল্যে যাতে সার কৃষকের হাতে পৌছায় সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। এতে দূর্নীতিবাজ সার ডিলাররা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। কৃষি কর্মকর্তা যে সৎ অফিসার সেটা ডিলাররাও বারবার দাবি করছেন। আবার তারাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে অনৈতিকভাকে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করিয়েছেন। তিনি বলেন এভাবে যদি সৎ এবং সরকারের ভাবমূর্তি উন্নয়নকারী কর্মকর্তাদের ভালকাজের পুরস্কারের পরিবর্তে ভোগান্তিমূলক বদলি করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে কেউ আর ভালো কাজ বা সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল করতে চাইবেন না।’’
উপজেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি ও উপজেলা বিএনপির ১নং যুগ্ম আহবায়ক ইউনূচ আলী দফাদার বলেন, ‘‘ ৯৫-৯৬ সাল থেকে আমি উপজেলা ফার্টিলাইজারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর মাসুদ (উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী) সেক্রেটারী। তিনি বলেন আমাদের কৃষি অফিসার খুব সৎ লোক। যে আইন আছে প্রাকটিক্যালি তো সব কাজ করা যায় না। যেমন আমি গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছি সিংহঝুলি, রোডের গায়ে তিনটে দোকান আছে। আমরা সেখানে সার নামিয়ে দেব উনি সেটা মানবেন না। মানে উনি শতভাগ নিয়ম মানতে চান, কিন্তু মানবিক দিক তো আছে। নিজেদের গুদামে সার নামিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের ঘরে বিক্রি করলে আমাদের বাড়তি লেবার ও বহন খরচ হয়। তিনি বলেন আমরা আগেও নিয়ম মেনে চলতাম, এখনও নিয়ম মেনে চলছি। আপনারা কৃষি অফিসারকে টাকা দিয়ে বদলি করিয়েছেন বললে তিনি বলেন এত টাকা আমরা কোথায় পাবো? আপনারা তো তার বিরুদ্ধে দরখস্ত করেছেন, আপনি বলছেন অফিসার সৎ কিন্ত আপনারা তার বিরুদ্ধে দরখাস্ত করেছেন তখন তিনি বলেন এটা দুঃখজনক। আপনি বলছেন দরখাস্তে আপনার স্বাক্ষর আছে অথচ আপনি বলছেন কে দরখাস্ত করেছে জানেন না তখন তিনি বলেন সব কথা বলা যায় না। তিনি আরো বলেন দরখাস্তে ১৬ জন ডিলারেরই স্বাক্ষর আছে। আমার স্বাক্ষর করা অনেকটা অনুরোধে ঢেকি গেলা। আপনারা তো সেখানে অফিসার জামায়াত করে বলেছেন তখন ইউনূচ আলী বলেন না না তিনি ভালো লোক, তবে তিনি কি করেন আমি জানিনা। না জেনে একজনকে জামায়াত লিখে দিলেন? তিনি বলেন শুধু জামায়াত নয় রাজাকারও লেখা হয়েছে। কার অনুরোধে আপনি ঢেকি গিলেছেন জানতে চাইলে বলেন এ বিষয়ে সন্ধ্যায় কথা বলবো। তিনি বলেন আমি বিএনপির সেক্রেটারি ছিলাম, ইউপি চেয়ারম্যান ছিলাম। আমার যে অন্যায় তা বাংলাদেশের হিসেবে নগণ্য। বাংলাদেশে অন্যায় কাজ হয় অহরহ। আমার অন্যায় হয়না তা না। আমার যে অন্যায় সেটা পার্সেন্টেন্সের মধ্যে পড়ে না।
উপজেলা সার ডিলার সমিতির সেক্রেটারী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ফুলসারা ইউপি চেয়ারম্যান মেহেদী মাসুদ চৌধুরী বলেন কৃষি অফিসার বদলি হয়েছে আমরা শুনিনি। তার বদলির পেছনে আপনার হাত আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন নিশ্চিত থাকেন এতে আমার হাত নেই। কেন আমি বদলি করবো? আমি বদলি করলে তো আরেকজন আসবে নিয়মানুসারে। আমি অফিসার বদলির পক্ষে নয়। ফার্টিলাইজারি এসোসিয়েশন চাইলে তো কারো পোস্টিং হবে না। পোস্টিং তো অফিসারদের গতানুগতিকভাবে হয়। আপনাদের সভাপতি  ইউনূচ দফাদারের (বিএনপি নেতা ইউনূচ দফাদার) লাইসেন্স বাতিল ঠেকাতে.. তখন তিনি বলেন তার (ইউনূচের) লাইসেন্স বাচার কোন সম্ভাবনা নেই। ইউনূচ দফদারের লাইসেন্স বাতিলের রেজুলেশন যশোরে (জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আপনারা দরখাস্তে বলেছেন কৃষি অফিসার নাকি খুব খারাপ লোক, উনি নাকি জামায়াত ইসলাম করেন, কোন কোন ক্ষেত্রে রাজাকারও বলা হয়? উত্তরে তিনি বলেন উনার কি ৭১ এ জন্ম হয়েছে? আপনারা যে দরখাস্ত করেছেন সেখানে.. তখন বলেন দরখাস্ত তো এক্সেভ করা হয়নি। দরখাস্ত তো আমি করি নাই, আমি আবারো বলছি দরখাস্ত আমি করি নাই। দরখাস্ত যেটা করা হয়েছিল সেটা ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। আমার কাছে ডিডি ফোন করেছিলেন আমি বলেছি ওটা ভুল বুঝাবুঝি। পরে সেটা ফেরৎ পাঠানো হয়েছে। সেটা কৃষি অফিসারের কাছে আছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার রইচ উদ্দিন বলেন, আমরা সরকারি চাকরি করি। আমাদের বদলি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে একটা ভালো কাজ করতে গিয়ে, সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার পৌছাতে গিয়ে এমন অর্ডার হওয়ায় কিছুটা হতাশ হয়েছি। এমন হলে ভালো কাজে উৎসাহ হারিয়ে যায়। আবার যারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ঠ করতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ও নিয়মের মধ্যে থেকে সার বিক্রি না করে অনিয়ম করছে তারা আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়।

মুবার্তা/এস/ই

ফেসবুকে লাইক দিন