আজঃ শনিবার ● ৩০শে চৈত্র ১৪৩০ ● ১৩ই এপ্রিল ২০২৪ ● ২রা শাওয়াল ১৪৪৫ ● রাত ১২:০২
শিরোনাম

By মুক্তি বার্তা

গল্প- “শ্মশান ঘাটের দুই ছেলে”

প্রতিকি ছবি

কেয়ন ইমরান: এক গ্রামে এক হিন্দু বাস করত। তার নাম শ্রী অনন্ত। তার ছিল মাত্র দুই ছেলে, কোন মেয়ে ছিল না। ছেলে দুটো ছিল খুব শান্ত। তবে স্কুলে যেত না। ছেলেদের নাম গোবিন্দ আর নিতাই। ওরা দুই দাদা মি‌লে মিশে থাকত আর সকাল হলেই মাছ ধরতে যেত। তাই একদিন নিতাই বলল, “ চল দাদা আজ আমরা সারা বাওড় বেড়াবো আর মাছ ধরব। যাবি তো দাদা”, নিতাই বলে। গোবিন্দ বলে, ” যাব মানে, চল তাড়াতাড়ি চল, সব গুছিয়ে নে।“

কেয়ন ইমরান (কবি ও লেখক)- ফাইল ফটো

ওরা নৌকা নিয়ে রওয়ানা হল। কোথায় যে যাবে তারা তা সঠিক জানে না। যেতে যেতে নিতাই – এর মনে একটা ভাবোদয় হল। সে বলে, “ দাদা, এখন যদি আমাদের নৌকা একটা মাছ এসে ফুটো করে দেয়, তাহলে কি হবে?“ গোবিন্দ বলে, ”চুপ কর নিতাই, অমন অলুক্ষণে কথা বলিস নে। আমাদের নৌকা ফুটো হয়ে গেলে তো আমরা মরে যাব।“ একথা বলতে না বলতেই তারা শ্মশান ঘাটে এসে পৌঁছালো।
নিতাই খুব চালাক। সে জানে এটা শ্মশান ঘাট। তবুও বলে, ”দাদা এটা কি? এখানে হাড়-গোড় আর মরা মানুষের মাথার খুলি পড়ে আছে কেন?“ গোবিন্দ বলে, “কেন নিতাই বুঝলি নে এটা হল শ্মশান। আমরা মারা গেলে এখানে নিয়ে আসবে।“ গোবিন্দ সহজ-সরল মানুষ, তাকে কেউ কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে তার উত্তর জানা থাকলে সে অবলীলায় বলতে থাকে। তাই নিতাই আবার বলতে থাকে- দাদা, এরপর কি হয়? ”এখানে এনে আমাদের পোড়াবে এবং স্বর্গে চলে যাব“- বলে গোবিন্দ। নিতাই বলে, “দাদা, মরার আগে স্বর্গে যাওয়া যায় না?“গোবিন্দ বলে, ”দূর বোকা মরার আগে কি স্বর্গে যাওয়া যায়? এখন ওসব কথা বাদ দে। চল, মাছ ধরতে যায়।

প্রতিকি ছবি

ওরা মাছ ধরতে লাগল সেই শ্মশানের পাশে। সেদিন তারা অনেক মাছ পেয়েছে। মাছ ধরে বাড়ি চলে আসল। তখন শ্রী অনন্ত অর্থাৎ ওদের বাবা বলে , “তোরা আজ এত মাছ পেয়েছিস কোথায়?“ গোবিন্দ কোন কিছু বলার আগে নিতাই বলে, “বাবা, শ্মশান ঘাটের পাশে।“
-কি, তোদের এত বড় সাহস! তোরা ওখানে গিয়েছিস তোদের কপাল ভালো, যে কিছু হয় নি।
নিতাই ওর বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, “বাবা, ওখানে গেলে কি হয়? ওদের বাবা বলে, “ওখানে যেতে নেই, ওখানে চাঁদনী রাতে কবিরাজেরা সাধনা করতে যায়। জানিস? দুই ছেলেই বলে, “না তো বাবা। বলো তারপর কি হয়?“
-ওখানে সেই রাতে গেলে চারপাশ থেকে ভয় দেখাতে থাকে, যে ওদের ভয় পায় তারা মারা য়ায়।
-বাবা, ওরা কারা?
-ওরা হল আমাদের মত মানুষ। কিন্তু মৃত, আর মৃত হলে জ্বীন হয়ে যায়। ওখানে কবিরাজেরা কালি সাধন করতে যায়। তাই কিছু চাল ভাজা, ব্লেড, জালের কাঠি- এসব নিয়ে যায়। এসব ওদের খেতে দেয়। এসব খেয়ে খেয়ে যখন আর না পারে তখন যা চাই তাই দেয়। ওসব এখন বাদ দে। যা বাজারে গিয়ে মাছ গুলো বিক্রি করে আয়।
গোবিন্দ আর নিতাই দুই দাদা মিলে সেই মাছ গুলো বিক্রি করে আনলো। তারপর ওরা দুই দাদা শুধু ভাবতে থাকে, সবার কাছে শ্মশান সম্বন্ধে জানতে থাকে। গোবিন্দ তো ভয়ের জন্য শ্মশানে যেতে চাই না। নিতাই বলে-
– আমি যাব দাদা, তুই না গেলেও।
-কিন্তু বাবা যদি ধরতে পারে তখন কি হবে, নিতাই?
-কিচ্ছু হবে না। আর শোন দাদা, এখন আমাদের সবকিছু জোগাড় করতে হবে।
নিতাইয়ের কথায় গোবিন্দ সাহস পায়। সে বলে, “হ্যাঁ, তাহলে আমিও যাব।“ তারপর ওরা রাত্রে না ঘুমিয়ে ব্লেড, চাল, জালের কাঠি ইত্যাদি সংগ্রহ করে।
সকালের খাবার খেতে খেতে গোবিন্দ বলে, ”নিতাই, সে গুলো ভালো জায়গায় রেখেছিস তো?“ নিতাই কিছু না বলে ইশারা করে একটা আঙ্গুল মুখের উপর রেখে চুপ করতে বলে। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে নিতাই ও গোবিন্দ বাইরে আসে। নিতাই বলে-
-দাদা, তুই তো একটা মস্ত পাগল। আর একটু হলে সব জেনে ফেলত, মা। দাদা শোন, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। সে কথা রাতে বলব।
সকালে আজ ওরা মাছ ধরতে না গিয়ে বাড়ির কাজে মন দিল। আজ ওরা একটা বাগান তৈরি করছে। এই বাগানটা হলো শাক-সবজির বাগান। কারণ, ওরা দেখে এসেছে উত্তর পাড়ার কলিম শেখের ছেলে একটা বাগান তৈরি করেছে। বাগানটি তৈরি করতে দুপুর হয়ে গেল। দুপুর বেলা ওরা নায়তে গেল। নেয়ে এসে কাপড় পরে মায়ের কাছে ভাত চাইল। মায়ের হাতের খাবার খেয়ে এক ঘুমেই বিকাল শেষ। ঘুম থেকে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে নিলো। এবার গোবিন্দ বলে-
-নিতাই, তুই যে সকালে বলে ছিলি তোর মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। সেটা কি?
-তাহলে শোন, এটা হলো আমরা দুই জনে যে এক জায়গায় শুয়ে থাকি না তাই। তবে ওখানে আমাদের মতো দুটো মানুষ বানাতে হবে।
-কিভাবে নিতাই?
-এখন শুনে তোর কোন লাভ নেই, পরে বলা যাবে।
সন্ধ্যা হল। ঘরে বিদ্যুৎ আছে তাই বৈদ্যুতিক বাতিটা জ্বেলে দিল। মা রান্না করছে, এদিকে ওরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত। রাত আটটা বাজতেই ওরা মায়ের কাছে ভাত চাইল। মা ও ডাক দিল খাওয়ার জন্য। খাওয়া শেষে ভেজা জাল শুকাতে দিল। তারপর সবাই শুয়ে পড়ল।
অনেক ক্ষণ পর নিতাই উঠল এবং দেখল বাবা-মায়ের গভীর ঘুম চলছে। নিতাই এবার চুপি চুপি এসে গোবিন্দকে বলল, “দাদা, ওঠ এখন যেতে হবে। শোন, আরও কিছু জালের কাঠি লাগবে, জালটা খোল।“
এদিকে নিতাই জালের কাঠি, চাল ভাজা আর ব্লেড নিবে এমন সময় গোবিন্দ জাল খুলতেই শো-শো শব্দ হয়েছে। ওদের বাবা শব্দ শুনে বলে-
-নিতাই, দেখ তো বাবা বৃষ্টি এলো কি না।
-না বাবা, বাতাস হচ্ছে, তাই ওরকম শব্দ হয়েছে।
-আচ্ছা, বৃষ্টি এলে জালটা তুলিস।
-ঠিক আছে বাবা।
ওদের বাবা শুয়ে পড়ল। গোবিন্দ এবার খুব সাবধানে জালটা খুলে নিয়ে এলো। জাল থেকে কিছু কাঠিও ছাড়িয়ে নিলো। নিতাইকে বলল-
-নিতাই, এবার মানুষ তৈরি হবে কেমন করে?
-দাদা, আমাদের মাদুর দুটো মুড়িয়ে নে।
-তারপর?
-এবার দুটো মাদুর লম্বা করে রাখ।
-তারপর?
-এবার লেপ, কম্বল চাপা দে।
-তারপর?
-এবার দুটো ভাড় নিয়ে আয়। তারপর, ভাড় দুটো দিয়ে মাথা বানিয়ে ঢেকে দে।
-তোর মাথায় এত বুদ্ধি!
-চল দাদা, এখন ওসব কথা বাদ দে। এখন রওয়ানা দে
ওরা রওয়ানা দিল সেই রাতে একটা নৌকা নিয়ে। আধা ঘণ্টা বাদে সেখানে পৌঁছালো।নৌকা থেকে নামলো এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেল। চারিদিক থেকে ওদের ভয় দেখাতে লাগল। কেউ ভাল্লুক, কেউ বাঘ আবার কেউ দৈত্য হয়ে। নিতাই কোন কিছুতে ভয় পায় না। গোবিন্দ খুব ভীতু। নিতাই বলে, “দাদা, ভয় করলে তুই মারা যাবি। তার চেয়ে বরং আমার পিছনে এসে বস।“
কিছুক্ষণ পর দৈত্য-দানবেরা ফিরে গেল। এবার নিতাই সামনের দিকে এগিয়ে দেখে এক যুবতী মেয়ে হা করে শুয়ে আছে। নিতাইয়ের কিছু করতে ভুল হল না। সে যুবতীর বুকের উপর বসলো। আর চাল ভাজা, ব্লেড, জালের কাঠি খাওয়াতে লাগল। গোবিন্দ নিতাইয়ের পিছনে বসে রইল। হঠাৎ এক সময় সব ফুরিয়ে গেল। তখন নিতাইয়ের কথায় গোবিন্দ কচুরীপানা তুলে নিয়ে আসলো। যুবতী মেয়েটা খেয়ে খেয়ে আর পারল না। তখন জিজ্ঞাসা করল, “তোরা কি চাস?“ গোবিন্দ বলে, “আমি পানতা ভাতে কলা পাকা চাই।“ আর নিতাই বলে, “আমি চাই একটি প্রদীপ। যাতে থাকবে সাত রাজার ধন।“ যুবতী বলল, “যা পানতা ভাতে কলা পাকা পাবি। আর প্রদীপ পাবি বাওড়ের মাঝখানে। প্রদীপটা জ্বলছে, ঐ জ্বলন্ত প্রদীপ মৎস্য কন্যাকে ঠকিয়ে নিতে হবে।“
গোবিন্দ আর নিতাই শ্মশান থেকে ফিরছে এমন সময় দেখতে পেল দূরে প্রদীপটা জ্বলছে। কাছে গিয়ে দেখে এক মৎস্য কন্যা। এই মৎস্য কন্যাকে ঠকানোর জন্য শ্মশান থেকে বের হয়ে একটি মাছ ধরে ছিল নিতাই। সেই মাছটি ফেলতেই মৎস্য কন্যা ছুঁটে গেল। আর সেই সুযোগে প্রদীপটা নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হল গোবিন্দ আর নিতাই। বাড়ি এসে ভালো ছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। এক ঘুমেই সকাল।
ঘুম থেকে উঠেই গোবিন্দ পানতা ভাত আর কলা পাকা খেতে চাইলো আর নিতাই মাংস ভাত। ওদের মা তখন বলল, “কোথায় পাবো বাবা এসব?“ গোবিন্দ বলে, “মা, তুমি শিকেয় দেখো আছে।“ মা দেখলো সত্যিই পানতা ভাত আর কলা পাকা।
নিতাই তার কাছের প্রদীপ ঘষা দিয়ে এক দৈত্য হাজির করলো। তখন সবাই ভয় পেয়ে গেল। নিতাই বলল, “মা, তোমার ভয় নেই। ও আমাদের জন্য মাংস আর ভাত নিয়ে আসবে।“
দৈত্যটি নিতাইয়ের হুকুমে খাবার নিয়ে এলো। মা তখন মহা খুশি। এই ভাবে ওদের দিন চলতে লাগল আর সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল।

ফেসবুকে লাইক দিন