আজঃ শনিবার ● ১০ই আশ্বিন ১৪২৮ ● ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২১ ● ১৭ই সফর ১৪৪৩ ● দুপুর ১২:৫৬
শিরোনাম

By: মুক্তি বার্তা

ওয়ান ইলেভেনকালীন দৈনিক আমাদের সময় ও  স্মৃতিকথন….

ফাইল ছবি

সোহেল সানিঃ দৈনিক আমাদের সময় পদার্পন করছে সতের বছরে। জনপ্রিয় এ দৈনিকটিতে আমিও ছিলাম প্রতিষ্ঠার প্রথম দিবস থেকে। আধুনিক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নাঈমুল ইসলাম খানের আমাদের সময় – এর কথা শোনা যেতো সবার মুখে মুখে, বিশেষ করে রাজনৈতিক মহলে তো বটেই।
তখন আমার স্বনামে বহু লিড-ব্যানার লিড স্টোরি প্রকাশ হয়েছে পত্রিকাটিতে। চাকুরি ছাড়ার পরও নাঈম ভাইয়ের অতি স্নেহধন্য হিসেবে আমাদের সময় লিখেছি অতিথি প্রতিনিধি হিসেবে। দেশে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিনের যোগদানের পরেও মাঝেমধ্যে লিখেছি।
বহুল আলোচিত সমালোচিত ওয়ান ইলেভেনের সময়ের কথাই এখন বলবো। শ্রদ্ধেয় নাঈমুল ইসলাম খানের সম্পাদনায় ও তাঁর নেতৃত্বাধীন মালিকানায়  দৈনিক আমাদের সময় সংবাদপত্রের ইতিহাসে কতগুলো আগুনঝরা দিনের জন্ম দিয়েছিল।  আলোচনার শীর্ষে পৌঁছে ছিল পত্রিকাটি। এর কারণও ছিল নাঈমুল ইসলাম খান ইতিপূর্বেই আজকের কাগজ ও ভোরের কাগজের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত অধ্যায় রচনা করেছিলেন সাংবাদিকতাকে আলোকিত করে।
আমি আমাদের,সময় বহু রিপোর্ট করেছি। এর মধ্যে আজ আমার দুটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করবো। যা পাঠকের মনে মোটাদাগ ফেলেছিলো বলে মনে হয়েছিলো সে সময়ে।
একটি রিপোর্ট, আমাদের সময় প্রথম পাতায় লাল আখরের ব্যানার লিড করেছিল।
যার শিরোনাম ছিল-
“রাজনীতিবিদদের সাজা হয়, ভোগ করতে হয় না!”
অপরটির শিরোনাম ছিল-
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পদের দাম দুটো পেরাডো গাড়ির সমান!”
যাহোক, রাজনীতিবিদের নিয়ে করা প্রথম রিপোর্টটি প্রকাশের দিন খুব ভোরে আমার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তৎকালীন দৈনিক ইত্তেফাকের কুটনৈতিক প্রতিনিধি শ্রদ্ধেয় আলমগীর হোসেনের মিষ্ট কন্ঠের অভিবাদন কানে ভেসে আসে।
পরবর্তীতে বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদ মাধ্যম বাংলা নিউজের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হন আলমগীর হোসেন। তাঁর সেদিনের মুঠোফোনে রিপোর্টটির ভূয়সী প্রশংসা আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমার সাংবাদিকতা জীবনে একটি তথ্যবহুল রিপোর্ট পড়লাম – সোহেল সানি তোমাকে শুভেচ্ছা।”
ওই সময়টা ছিল এক রাজনীতির টালমাটাল অবস্থা। চারদিকে ধরপাকড়। গ্রেফতার হয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়া।
বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ, বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র বিএনপির তৎকালীন প্রথম যুগ্ম মহাসচিব  তারেক রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ওবায়দুল কাদের, আফম বাহাউদ্দীন নাসিমসহ  অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা। ওই  গ্রেফতার ছিল মূলত, দুর্নীতির অভিযোগে।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়াও গ্রেফতারবরণ করেন। তাঁরা দুজনই দীর্ঘদিন কারা অন্তরালে ছিলেন।
আমার রাজনীতিবিদদের নিয়ে করা রিপোর্টটি ছিল তথ্যউপাত্ত সমৃদ্ধ। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ওয়ান ইলেভেন সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত ৪৫ রাজনীতিবিদের দুর্নীতির মামলায় সাজা এবং পরিণতি কি হয়েছিল তার বিস্তারিত বর্ণনা ছিলো।
কার্যত কাউকেই সাজা ভোগ করতে হয়নি বরং সামরিক সরকারের যোগদানের সুবাদে অনেকেই মন্ত্রী হয়েছেন। কেউ উপরাষ্ট্রপতি আবার কেউ  প্রধানমন্ত্রী ও  উপপ্রধান মন্ত্রীও হন। অথচ, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে তারা ছিলেন সাজাপ্রাপ্ত।
 সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী গ্রেফতারকে কথিত সুশীল সমাজ স্বাগত জানালেও তাঁরা নিজ নিজ দলে ছিলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায়। যা দুটি দলেরই শীর্ষ নেতারা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। যে কারণে দুটি দল থেকেই ছিটকে পড়তে হয়েছে বাঘা বাঘা নেতাদের। যদিও আওয়ামী লীগ বিএনপি কেউই বাঘা বাঘা সেই নেতাদের শূন্যতা পূরণ করতে পারেননি আজো।
যাহোক ফিরে আসছি, আমাদের সময়ে আমার সেই রিপোর্টের প্রসঙ্গে।
আগেই বলেছি একটি বিশেষ রিপোর্টটির শিরোনাম ছিলো, “আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের পদের দাম দুটো পেরাডো গাড়ির সমান!!”
রিপোর্টের মূল ভাষ্য ছিলো, আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোসের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন এক নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সচিব সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ছিল সরাসরি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েই ছিল মূলত একটি গোপনীয় লড়াই। বর্ষীয়ান নেতা আব্দুল জলিল কারারুদ্ধ হলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের লাইম লাইটে উঠে আসেন। কিছুদিনের মাথায় তিনিও গ্রেফতার হন। দুই নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও অচিরেই তিনি লন্ডনে চলে যান। তখন তিন নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসীন হন মুকুল বোস। তিনি মুঠোফোনে আমাকে তাঁর বাসায় ডেকে পাঠান। আমি তখন আমাদের সময়ের অতিথি প্রতিনিধি এবং দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধিও।
আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে দলের এক নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কতিপয় অভিযোগ আনেন। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – মুকুল বোসকে একটি স্পর্শকাতর গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন দিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত করার অপচেষ্টা করার। অবিলম্বে তাঁকে বিদেশ গমন করতে বলা হয়। বিকল্প প্রস্তাবটি ছিল আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বপালনে স্বেচ্ছায় অপারগতা প্রকাশ। এ জন্য তাঁর ওপর মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ভয় প্রদর্শন করে বলা হয়, নয়তো তাঁকে কারাগারে বেছে নিতে হবে।
মুকুল বোসের ভাষ্য মতে, তিনি তাদের প্রস্তাব মেনে নিলে গনতান্ত্রিকভাবে দলের এক নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হবেন সাবের হোসেন চৌধুরী। সাবের হোসেন চৌধুরী এই গোয়েন্দাদের দিয়ে অনৈতিক কর্মটি করেন বলে মুকুল বোস উল্লেখ করেন। সাবের হোসেন চৌধুরী ওই সময় টু থিউরি বাস্তবায়নে সক্রিয় তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন বলে নেতাকর্মীদেরও অভিযোগ ছিলো। যা হোক মুকুল বোস এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। তিনি বলেন, কোনো পেশি শক্তির কাছে তিনি নতিস্বীকার করবেন না।  যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য নিজের সাহসী মনোভাবের কথা জানিয়েছিলেন মুকুল বোস।  ঠিকই তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ফের লন্ডন থেকে ফিরে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত।
প্রসঙ্গতঃ সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন- মঈনুদ্দিনের সেই সরকারের টু থিউরির ( দুই নেত্রী মাইনাস) লক্ষ্য বানচাল হবার পর বঙ্গবন্ধু কন্যা নির্বাচনে মহাবিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন। তিনি সংস্কারপন্থী বলে কথিত সকল নেতার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পদপদবী কেড়ে নেন। সেই স্রোতে মুকুল বোস যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ হারান। একইভাবে পদ হারান সাবের হোসেন চৌধুরীও। তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের পদই শুধু নয় অপসারিত হন আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক সচিবের পদ থেকেও। মুকুল বোস আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পেলেও সাবের হোসেন চৌধুরী দলীয় কোনো পদে নেই। তাঁর বর্তমান সংসদীয় আসনটিও ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রায় হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিলো। তখন জানা যায়, একটি মার্কিন লবিং – এ শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পেয়ে এমপি হন সাবের হোসেন চৌধুরী।
আমাদের সময়ের জন্মদিনে পাঠকদের স্মরণ করছি ভালোবাসা দিয়ে, শুভেচ্ছা জানিয়ে।
দৈনিক আমাদের সময় পরিবারকে শুভেচ্ছা এবং অফুরান ভালোবাসা। শুভ কামনা নিরন্তর।
মুবার্তা/এস/ই

ফেসবুকে লাইক দিন